
ক. আইনী ও প্রশাসনিক:
১। “বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬” প্রণয়ন;১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ অধ্যাদেশটি গেজেটে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালে ‘হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ এবং ২০১৬ সালে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হলেও কোন আইনি কাঠামো না থাকায় হাওর সুরক্ষায় বোর্ড বা অধিদপ্তর কর্তৃক কোন কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। হাওর হচ্ছে মিঠা পানির বিস্তীর্ণ জলাভূমি যা বাংলাদেশের একটি অনন্য প্রতিবেশ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ প্রণয়নের ফলে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের দায়িত্ব, কর্তৃত্ব এবং অধিক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট হলো।
এই অধ্যাদেশের অধীনে অধিদপ্তর হাওরের তালিকা প্রণয়ন করবে, সীমানা চিহ্নিত করবে, সংরক্ষিত হাওর ও জলাভূমি এলাকা ঘোষণা করতে পারবে এবং হাওর ও জলাভূমি এলাকায় জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সুরক্ষা আদেশ জারি করতে পারবে। একইসাথে হাওর ও জলাভূমি এলাকায় নিষিদ্ধ কার্যক্রমের বিবরণ, নিষিদ্ধ কার্যক্রম সংঘটিত হলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা এবং উক্ত অপরাধের জন্য দণ্ড আরোপে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
অধ্যাদেশ প্রনয়ণের পাশাপাশি হাওর মাস্টারপ্লান হালনাগাদের কাজও শুরু করা হয়েছে।
২। ‘ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪’, ২৬ আগস্ট, ২০২৫ প্রণয়ন
পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং পরিচালনা ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদী খনন, নৌরুট সৃষ্টি বা পুনরুদ্ধার; মৎস্য, কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন; জলাভূমির জীববৈচিত্র্য, বিভিন্ন জলজ প্রজাতির প্রজনন ও আবাসস্থল সুরক্ষা; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলাসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে সর্বজনীন ব্যবহারের জন্য ‘ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতিমালার ফলে ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাটি ভরাটে, ইট ভাটায় ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো।
৩। শিল্প খাতে পানি ব্যবহার নীতিমালা চূড়ান্তকরণ:
এই নীতির ফলে শিল্পকাজে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্তোলনে নিয়ন্ত্রন আরোপ সম্ভব হবে। শিল্প খাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পানির স্তর আশংকাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানির অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে। দেশের শিল্পঘন এলাকায় পানির স্তর যাচাইপূর্বক শিল্পখাতে পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, পানির পুন:ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ, ব্যবহৃত পানির মান নিয়ন্ত্রণ ও পানির জন্য প্রদেয় মূল্য নির্ধারনের প্রয়োজনীয় ভিত্তি প্রস্তুত করতেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
৪। UN Water Convention এর পক্ষভুক্ত হওয়া
প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে UN Water Convention, 1992 অনুসমর্থন করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পানি সম্পদ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারবে বাংলাদেশ । ভাটির দেশ হিসাবে আর্ন্তজাতিক নদীতে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবী বৈশ্বিক পরিমন্ডলে তুলে ধরতে এই সংস্থার সদস্যপদ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।
৫। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাথে চুক্তি
যুক্তরাজ্যের দূতাবাসের বিশেষ সহায়তায় জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে পানি সংক্রান্ত দুর্যোগ বিষয়ে পূর্বাভাস পাওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে UK MET Office এর সাথে চুক্তি সম্পাদনের ফলে Real Time Data প্রাপ্তির পথ সুগম হবে এবং ঘুর্নিঝড়, আগাম বন্যাসহ দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদানের সক্ষমতা বাড়বে।
৬। চীনের Changjiang Water Resources Commission সংস্থার সাথে Joint
Working Group গঠন দেশের সকল নদ-নদী ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে এবং বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে চীনা বিশেষজ্ঞদের সাথে Joint Working Group গঠন করা হয়েছে। এই Working Group এর কর্মপরিধি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে যেখানে বিভিন্ন নদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে করণীয় নির্ধারনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।
৭। ভারতের সাথে গঙ্গাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বিষয়ে যৌথ নদী কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে।
৮। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় শৃংখলা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে External অডিট এর উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে ভূমিকা রাখবে ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পরিচালনা পর্ষদ এ প্রকৃত উপকারভোগী ও সুশীল সমাজের অন্তর্ভূক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিতা বাড়বে।
বিভিন্ন জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এর অধিগ্রহণকৃত জমির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং অবৈধ দখল থাকা মূল্যবান জমি উদ্ধারে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যেমন –
বোট ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর দখল থেকে আইনী প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে শুধুমাত্র ঢাকায় ৮৫০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে;
চট্টগ্রাম জেলায় উত্তর কাট্টলি এলাকায় স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন অবৈধ দখলে রাখা ৪০ একর ২০০০ কোটি টাকা বাজার মূল্যের জমি উদ্ধার ও LNG Terminal স্থাপনে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে;
চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ কাট্টলি এলাকার অবৈধ দখলে থাকা ৫৮.৭১ একর অতিমূল্যবান জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে নামজারির আইনী প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিনিয়র সহকারী পরিচালক পদে গ্রেড পরিবর্তন করে ৭ম গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন আটকে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ৪০ জন সার্ভেয়ার এর নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
পানির মান যাচাইয়ের সুবিধার্থে WARPO কর্তৃক আধুনিক ল্যাব স্থাপন।
আবেদনকারী কর্তৃক ট্রাকিং নাম্বারের মাধ্যমে নিজ আবেদন/অভিযোগ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রেখে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে প্রেরিত আবেদন ও অভিযোগ নিষ্পত্তিকল্পে অনলাইন (https://service.bwdb.gov.bd/) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
খ। কার্যক্রম সংক্রান্ত
বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ভাঙনরোধ, নদী তীর সুরক্ষা ও জলাবদ্ধতা সংক্রান্ত নিয়মিত ৬৫ টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সংস্থাগুলোর কাজের প্রাধিকার নির্ধারণ, পদ্ধতি ও ধরনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের জনদাবীতে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে। এমন কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ নীচে উল্লেখ করা হলো-
১। নদী ও খালের তালিকা প্রণয়ন
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক একত্রে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত স্থানীয় নদীকর্মী সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কর্তৃক প্রেরিত তালিকা যাচাইবাছাইপূর্বক সুন্দরবন ও পার্বত্য জেলা ছাড়া দেশে বাদবাকি এলাকার ১৪১৫ টি নদীর তালিকা চূড়ান্তকরণ এবং ১লা বৈশাখ ১৪৩১ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সকল জেলা প্রশাসক থেকে সংগৃহীত তালিকার ভিত্তিতে দেশের খালের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
২। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি
এই গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউটটিতে লোকবল থাকলেও গবেষণা কাজে তেমন কোন অর্থায়ন ছিল না বললেই চলে। এই ইনস্টিটিউটটিকে বিভিন্ন অঞ্চলের নদীকেন্দ্রীক সচেতনতামূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি গবেষণা কাজে নতুন প্রকল্প দেয়া হয়েছে। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের নদীর তালিকা সম্পূর্ণ করতে সুন্দরবন ও পার্বত্য জেলায় নদীর সমীক্ষা পরিচালনার, সীমান্ত নদী তালিকা প্রণয়ন ও অবস্থা নির্ণয় এবং নদীতে বালু ও পাথর উত্তোলনের প্রভাব যাচাইয়ে গবেষণা কাজ শুরু করেছে। প্রথমবারের মত নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট নদী বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের ইন্টার্ণশিপ প্রদানের কাজ শুরু করেছে এবং প্রথম দফায় ৬ জনকে তিন মাসের ইন্টার্ণশিপ প্রদান করা হয়েছে।
৩। পানি আইনের প্রয়োগ শুরু
২০১৩ সালে প্রণীত হলেও পানি আইনের অধীনে কোন প্রয়োগ কার্যক্রম গৃহীত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার পানি আইনের প্রয়োগের কাজ শুরু করে এবং প্রথমবারের মত নিম্নলিখিত কাজ সম্পন্ন করে –
মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় নদী দখল করে গড়ে ওঠা সিমেন্ট কারখানার উচ্ছেদে অপসারণ আদেশ প্রদান।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ-২০২৫’ জারি।
সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে দেশের ৪টি (রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও নওগার ৪৭টি ইউনিয়ন এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার ৩টি ইউনিয়ন) এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ও ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
৪। Blue Network কার্যক্রম
বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে সকল সংস্থাকে সংযুক্ত করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ উদ্যোগে অধীনে ঢাকার বিভিন্ন খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয় যা বাউনিয়া খালের খননের মাধ্যমে শুরু হয়। বিভিন্ন সংস্থার নিয়মিত বাজেট থেকে অর্থায়ন করে সমন্বিত উদ্যোগে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে গৃহীত এই কার্যক্রম পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন।
৫। ঢাকার নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে প্রকল্প চূড়ান্তকরণ
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার ৪ (চার) টি নদী (তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদী ও টঙ্গী খাল) ও ১৯ (ঊনিশ) টি খাল পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ পর্যায়ে প্রকল্প (Metro Dhaka Water Security and Resilience Program) করা হয়েছে যা বিশ্বব্যাংক বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।
৬। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে নদী দখল-দূষণমুক্ত করার কার্যক্রম বড় আকারের ব্যয়বহুল পরিকল্পনার বিপরীতে ছোট আকারের প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার বাইরে দেশের অন্যান্য বিভাগের অন্ত:ত ১টি করে নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় নদীকর্মী সমন্বয়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রেরিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে মোট ৭টি নদীর (লৌহজং, বাকখালি, মগড়া, সালতা, সুতাং, আলাইকুড়ি ও বারনই) প্রকল্পের অনুমোদন চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং আরো ৫ টি নদীর (বড়াল, করতোয়া, খোয়াই, হালদা, ও কীর্তনখোলা) প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন।
দেশের ৬৪ টি জেলার একটি করে নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা দিতে জেলা প্রশাসনকে দেয়া নির্দেশের প্রেক্ষিতে মোট ৬৩ জেলা থেকে প্রাথমিক ও ২৭ টি জেলা থেকে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি পরিকল্পনা প্রণয়নে জেলা প্রশাসন ছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী রক্ষা কমিশন এবং স্থানীয় নদী কর্মী সম্পৃক্ত ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট ফান্ডের অধীনে দেশের তিনটি সবচাইতে দূষিত লবনদহ, সুতাং ও হাড়ীধোয়া নদী দখল দূষণমুক্ত করার প্রথম পর্যায়ের কাজ প্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছরের প্রচেষ্টার অবসান ঘটিয়ে প্রবাহের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় বড়াল নদীতে থাকা আটঘড়িয়া ও চারঘাট স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে ফলে নদীতে পানি প্রবাহ বেড়েছে এবং এখন পর্যটকের আকর্ষনে পরিনত হয়েছে।
৭। বিল ও খাল রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ
দেশে অনেক বিল থাকলেও ভূমি রেকর্ডে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিল বলে কিছু উল্লেখ থাকে না বরং তা ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড থাকে। ফলে, বিল রক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ দূর্বল হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় আড়িয়াল বিল (১৩৬ বর্গ কিলোমটার), চলনবিল (১৪২৪৫০ হে: বা ৫৫০ বর্গমাইল) ও বেলাই বিল এর বিস্তারিত ভূমি সমীক্ষা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং চলনবিল ও আড়িয়াল বিল পুনরুদ্ধারে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে যার অধীনে এই বিলগুলোর জন্য মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করা হবে, বিলের পানি প্রবাহে বিদ্যমান বাঁধা চিহ্নিত করে অপসারণ করা হবে এবং বিলনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে বিলের পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করা হবে।
ঢাকার শুভাঢ্যা ও গাজীপুরের গাছা খাল রক্ষায় প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে ও কাজ শুরু হয়েছে।
৮। ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত উদ্যোগ
দীর্ঘদিন চলমান ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিরসনে তাৎক্ষণিক ও মধ্যে মেয়াদে কর্মসূচী ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যার ফলে ২০২৪ সালে ১৭৬২২ হেক্টর জমি এবং ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে ১৭ ই জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩২৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। একইসাথে ভবদহ এলাকায় বোরো আবাদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং এই এলাকার জলাবদ্ধতার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে প্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততার সাথে কার্যক্রম ও প্রকল্প গ্রহণ করা হয় যার মধ্যে রয়েছে পাম্প স্থাপনসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক টেকা, শ্রী, হরি, তেলিগাতি, আপারভদ্রা ও হরিহর নদীর ৮১.৫০০ কিলোমিটার খনন। একইভাবে বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবে শোলমারি নদী খননসহ পাম্প ক্রয়ের প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।
৯। জরুরী কাজে সাম্য, স্থানীয় অংশীজনের সম্পৃক্ততা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্ব আরোপ
বিক্ষিপ্তভাবে জরুরী (ইমারজেন্সী) কাজ না করে রংপুর বিভাগের ৫টি জেলাতে ভাঙনপ্রবন তিস্তা নদীর মোট ৪০.৪৮৫ কিলোমিটার Precautionary Work সম্পাদন করা হচ্ছে যার ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাজ সম্পাদিত হওয়া এলাকায় তিস্তা পাড়ের ভাঙন প্রায় শূণ্যের পর্যায়ে ছিল।
প্রতিটি জরুরী সহায়তা কাজে স্থানীয় অংশীজনদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে। জরুরি সহায়তা কাজে “সকলের জন্য সুরক্ষা” নীতি অনুসরণ করে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জরুরি সাহায্যের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে জরুরি কাজ টেকসই ও সাশ্রয়ী হয়েছে এবং অনিয়মের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে।
১০। আন্ত:নদী বিষয়ক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাস্তবায়নের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে যা পরিকল্পনা কমিশন প্রাথমিকভাবে অনুমোদন করেছে। এই ব্যারেজ বাস্তবায়ন হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, পদ্মা নির্ভর এলাকার নদী সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত হবে ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস পাবে, সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হবে, ২৬ টি জেলার নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে, জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন সরকারের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে যা বর্তমানে চীন সরকারের চূড়ান্ত যাচাইবাছাই-এর প্রক্রিয়াধীন। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো নদী ভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা।
১১। জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ
সিলেটে বন্যার ভয়াবহতা কমাতে সুরমা-কুশিয়ারা নদী অববাহিকার বন্যা নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে প্রকল্প যা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে।
২০২৪ সালে নোয়াখালী ও ফেনী জেলায় ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকারী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে জরুরী কাজ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বামনি ক্লোজার নির্মাণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রনে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণে প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে যার মাধ্যমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলায় ১.১৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচের পানি সরবরাহ করে ফসলের নিবিড়তা ২১০% হতে ২৬৮% এ উন্নীত করা সম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় এলাকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।
১২। সিলেটের সাদা পাথর সমৃদ্ধ নদী রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ ডাউকি (গোয়াইন), ধলাই, জাফলং, ভোলাগঞ্জ, উৎমাছড়া, বিছানাকান্দি, লাভাছড়া, রাঙাপানি ও লালাখাল রক্ষায় নদী পুনরুদ্ধার কর্মপরিকল্পনা এবং ইকো-ট্যুরিজম কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। “সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারী এলাকার নদী পুনরুদ্ধার ও ইকোট্যুরিজম” প্রকল্পটি ১৯৯২ সালের জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশনের পক্ষ হিসেবে প্রথম টুইনিং প্রোগ্রাম-যা নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক, কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহায়তায় স্বাক্ষরিত হচ্ছে। এটি একটি অংশগ্রহণমূলক (Participatory) পরিকল্পনা, যেখানে স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, সরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে নদী এবং একইসাথে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র করা যেতে পারে তা নিয়ে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হচ্ছে। পানি ও নদী বিশেষজ্ঞ, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ ও স্থপতিরা যাহার ক্ষেত্রে থেকে তাদের মূল্যবান দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মাস্টার প্ল্যানকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই করতে সহায়তা করছেন। এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নদী থেকে পাথর লুট বন্ধ হবে, নদীর পানি আবার স্বচ্ছ হবে, প্রাকৃতিক পর্যটন ফিরবে এবং স্থানীয় মানুষের সম্মানজনক ও টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা হবে।









