প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ; প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্নাঙ্গ বক্তব্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর:
মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ, ইউএনএফপিএ-এর নির্বাহী পরিচালক, সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,
শুভ অপরাহ্ন। এই আয়োজনে আপনাদের সবাইকে আন্তরিক স্বাগত জানাই।
এই উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট উদ্বোধন করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। সুইডেনের সাথে এবং ইউএনএফপিএ-এর অংশীদারত্বে যৌথভাবে এই আয়োজন করতে পেরে বাংলাদেশ গর্বিত।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা বিনিয়োগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনশক্তি এবং মানুষের উন্নত জীবনে রূপ নেয়। এ কারণেই আজকের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ’ বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
আমার সরকার একটি সহজ নীতিকে সামনে রেখে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাচ্ছে: ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।’ আমরা একটি সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার শুরু হবে পরিবার ও কমিউনিটি থেকে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের কর্মসূচির ভিত্তিতে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা; যেখানে নারী ও শিশুরা বিশেষ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
মাননীয় অতিথিবৃন্দ,
আমরা আরো ১ লাখ স্বাস্ব্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছি, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তাঁরা পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবেন, শুরুতেই স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করবেন এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবেন।
এই ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবায় একজন পেশাজীবীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-তিনি হলেন মিডওয়াইফ।
একজন পেশাদার মিডওয়াইফ শুধু দক্ষ প্রসবসেবা প্রদানকারী নন। গর্ভধারণের পূর্বপর্যায় থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত তিনি একজন নারীর আস্থাভাজন স্বাস্ব্যসেবাকর্মী হয়ে উঠতে পারেন।
আমার সরকার সারা বাংলাদেশে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এরই মধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা চাই, তাঁরা বহুমুখী দক্ষতাসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠুন।
তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রজননস্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন, গর্ভকালীন সেবায় সহায়তা করবেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রসবকে উৎসাহিত করবেন, জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করবেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উন্নততর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন এবং মা ও নবজাতকের সেবা নিশ্চিত করবেন-যার মধ্যে থাকবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, টিকাদান এবং শিশুর সুস্থ বিকাশে সহায়তা।
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, যার সূচনা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আমরা পেশাদার মিডওয়াইফারি শিক্ষা চালু করেছি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করেছি এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মিডওয়াইফদের নিয়োগ দিয়েছি।
বর্তমানে আমাদের ১১ হাজারেরও বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিডওয়াইফ রয়েছেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২৫ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সুইডেন ও ইউএনএফপিএ-এর সাথে আমাদের অংশীদারত্ব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
ইউএনএফপিএ-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ ২২টি জেলায় মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন সেবা সম্প্রসারণ করেছে। সেখানে দক্ষ মিডওয়াইফরা ১ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি প্রসবে সহায়তা করেছেন এবং সংকটাপন্ন মাতৃস্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।
এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়া মায়েদের গল্প এবং আশার আলো নিয়ে জীবনের পথে যাত্রা শুরু করা নবজাতকদের ভবিষ্যৎ।
সম্মানিত অতিথিবৃন্দ,
আমরা একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থাও গড়ে তুলছি। আমাদের লক্ষ্য হলো-প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি হেলথ কার্ড থাকবে, যা একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং ইলেকট্রনিক রেফারেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশের একজন গ্রামীণ নারীর কথা ভাবুন। তাঁর স্বাস্থ্যসেবার তথ্য বাড়ির কাছাকাছি কোনো কেন্দ্রে নিবন্ধিত হবে, তাঁর চিকিৎসা-সাক্ষাতের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তাঁর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো নথিভুক্ত করা হবে। তাঁকে যদি উচ্চতর পর্যায়ের কোনো হাসপাতালে পাঠানো হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় তথ্যও তাঁর সাথে যাবে।
মাননীয় অতিথিবৃন্দ,
নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ভাবনা শুধু গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কিশোরীদের স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ।
তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নারীর স্বাস্থ্যসেবার একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হতে হবে মিডওয়াইফারিকে। পরবর্তী পর্যায়ের এই কার্যক্রমে জাতীয় মালিকানা ও টেকসই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে প্রধান চালিকাশক্তি হতে হবে।
আজকের আলোচনা শুরু করার আগে আমি আপনাদের সামনে একটি লক্ষ্য তুলে ধরতে চাই:
প্রত্যেক নারী যেন তাঁর বসবাসের কাছাকাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অংশ হিসেবে একজন দক্ষ পেশাদার মিডওয়াইফের সেবা পাওয়ার সুযোগ পান।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো দেশব্যাপী মিডওয়াইফদের নিয়োগ ও সেবা নিশ্চিত করা, কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং একটি আধুনিক ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের সংযুক্ত করা।
এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে আমাদের একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এভাবেই আমরা প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাব।
আমি আমাদের সম্মানিত মন্ত্রীবৃন্দ, অংশীদার ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যবান মতামত শোনার জন্য আগ্রহী।
আপনাদের সময় ও অংশগ্রহণের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।








