মেহেরপুরে কয়েকদিনের অব্যাহত শীতে যবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন
আলী আহসান রবি
১২ ডিসেম্বর, ২০২৪
মেহেরপুরে কয়েকদিনের অব্যাহত শীতে যবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। শীতের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে নিচের দিকে নামছে তাপমাত্রার পারদ। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে চারদিক। এই সময়ে দরিদ্র শীতার্ত মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শীতজনিত রোগে এক সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২২৯ রোগী। জেলায় এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে পৌছায়নি গরম কাপড়।
আজ বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) সকাল ৬ টা এবং সকাল ৯ টার সময় চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিস চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলের তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। যা চলতি বছরে জেলার সর্বনি¤œ তাপমাত্রা।
গতকাল বুধবার (১১ ডিসেম্বর) তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আদ্রতা রেকর্ড করা হয়েছিল ৯৭ শতাংস।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিস বলছে, এখন থেকে প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা আরও কমবে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শৈত্যপ্রবাহও শুরু হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর একটু আগেই শীত পড়া শুরু করেছে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায়। এরপর থেকে তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাঝে ওঠানামা করছে।
এর আগে গত শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) এই এলাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরদিন শনিবার (৭ ডিসেম্বর) ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া পর্যবেক্ষক রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আকাশে কুয়াশা রয়েছে ও নিম্নচাপের কারণে আকাশ মেঘলা। আগামীকালও একই আবহাওয়া থাকতে পারে। কয়েকদিনের মধ্যে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হবার সম্ভাবনা আছে। তখন তাপমাত্রা আরও কমবে।’
এদিকে হিমেল হাওয়া ও কনকনে ঠান্ডায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সকাল থেকে সূর্যের দেখা মিলছেনা। দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টির মত পড়ছে কুয়াশা। দিনের বেলাতেও যানবাহনগুলো গতি কমিয়ে এবং হেডলাইট জালিয়ে চলতে দেখা গেছে। প্রচন্ড শীতে মানুষের পাশাপাশি প্রাণীকুলও জবুথবু হয়ে পড়েছে। তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ গরম কাপড়ের দোকানে ভিড় করছে।
এদিকে গত কয়েকদিনের হাড় কাঁপানো শীতে হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। শীতে বেশী দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। শীতজনিত কারণে শিশু ও বয়স্কদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগের প্রকোপ বেড়েছে।
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে (৫ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) শীতজনিত কারনে জেলায় ১ হাজার ২২৯ রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৫০ জন শিশু, ৫০৯ জন নারী ও ৩৭০ জন পুরুষ।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল গেলো এক সপ্তাহে ২৫৪ জন শিশু, ৩৬৩ জন নারী ও ২৯৩ জন পুরুষ রোগী শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে।
মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্্ের গত এক সপ্তাহে শীতজনিত কারনে ৯৪ রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ১৮ জন শিশু, ৪৮ নারী ও ১৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়া গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের গত এক সপ্তাহে শীতজনিত কারনে ২২৫ জন রোগী শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৭৮ জন শিশু, ৯৮ জন নারী ও ৪৯ জন পুরুষ।
জেলায় তিন লাখেরও অধিক মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। শীতার্থদের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারীভাবে কম্বল বা গরম কাপড় ভাগ্যে জোটেনি। তবে, কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কয়েক জায়গায় সামান্য শীতবস্ত্র বিতরণ করার খবর পাওয়া গেছে।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক, চিকিৎসক জমির মোহাম্মদ হাসিবুস সাত্তার বলেন, গত কয়েকদিন ধরে অধিকাংশ রোগীই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। শীতজনিত রোগ যেমন- সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। যার অধিকাংশই শিশু ও বয়স্ক। শিশুদের উষ্ণ স্থানে রাখা ও বয়স্কদের শীতজনিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এসময়টায় যতটা সম্ভব ঘরের ভেতর থাকা এবং শরীরকে সবসময় গরম রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন চিকিৎসক মহী উদ্দীন জানান, শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। সে কারনে স্বাস্থ্য কর্মীদের ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক সিফাত মেহনাজ জানিয়েছেন, শীতার্থদের জন্য এখন পর্যন্ত কম্বল, গরম কাপড় বা নগদ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থ্যা (এনজিও) আশা থেকে ৪ শ কম্বল পাওয়া গেছে। সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে। তবে, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের সাথে কথা বলা হয়েছে। শীতার্থদের জন্য মেহেরপুর জেলা পরিষদ থেকে ২৫ লক্ষ টাকার কম্বল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গা মেহেরপুরে রেকর্ড করা হয়, যা গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আর গত শীতে তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। যেটা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস।